নিউজ পোর্টাল । বাংলাদেশ সাংবাদিক জোট
স্যোশাল মিডিয়া

জীবনের মূল্য

জহিরুল চৌধুরী
আপনি যখন বাজারে একটি শার্ট কিংবা ফ্রক কিনতে যান, নিজের মনে এই হিসাবটাই প্রথমে বিবেচনায় আনেন- এটি আপনার চাহিদা কতখানি পূর্ণ করবে! অর্থাৎ পণ্যটির চাহিদার ভিত্তিতে আপনি নিজের মনে একটি দাম নির্ধারণ করেন, এবং ঐ দাম নিয়ে দোকানির সঙ্গে দর কষাকষি করেন। আরো স্পস্ট করে বললে পণ্যটি আপনার প্রয়োজন মেটাবে কি-না, মিটালে কতখানি? এর নামই লাভ-ক্ষতির হিসাব।

Cost benefit analysis, শুনতে খারাপ লাগলেও “জীবনের মূল্য” নিরূপিত হয় লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণে। তার মানে জীবন থাকলে লাভ কী, আর জীবন নষ্ট হলে ক্ষতি কী? রোগ, মহামারী কিংবা যুদ্ধে একটি সমাজে মানুষের জীবনের মূল্য নিরূপিত হয় এই cost benefit analysis-এর ভিত্তিতে।

প্রথম আলোতে পড়ছিলাম আসাদুলের মৃত্যুর ঘটনা। ১৮ বছরের আসাদুল ৪ লাখ টাকা খরচ করে গিয়েছিল লিবিয়ায়। পরিবারকে সুখে রাখার জন্য। একই সঙ্গে নিজের ভাগ্য বদলাতে। কিন্তু ভাগ্য তাকে ফাঁকি দিয়েছে। ২৬ জন বাংলাদেশির সঙ্গে তারও মৃত্যু ঘটেছে লিবিয়ায়। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে যেতে তার দরকার ছিল আরো ১০ লাখ টাকা (১২ হাজার ডলার)। সে জন্যই ভাইকে মেসেজ পাঠিয়েছিল মোবাইলে। কিন্তু ভাইয়ের মেসেজ দেখার সুযোগ হয়নি। তার আগেই মাফিয়া চক্র গুলি মেরে হত্যা করে তাদের।
এর পাশাপাশি আরেকটি খবর “সুখবর” হিসেবে প্রচার করে পত্রিকাগুলো। বছর ঘুরে আসার এক মাস আগেই রেমিটেন্সের লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেছে। তার মানে- এই মহামারির কালে স্বজনরা কেমন থাকবে সে আশঙ্কায় প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাতে কার্পণ্য করেননি মোটেও। বিডিনিউজের শিরোনাম বলছে- “করোনাভাইরাস সঙ্কটে আমদানি ও রপ্তানি তলানিতে নেমে আসলেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স এখনও অর্থনীতিতে আশার আলো জাগিয়ে রেখেছে।”

এজন্য অর্থমন্ত্রী নিজেকে বাহবা দিয়ে বলেছেন- ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার কারণেই রেমিটেন্স বেড়ে হয়েছে ১৬.৩৬ বিলিয়ন ডলার। গত বছর একই সময়কালে যা ছিল ১৫.০৫ বিলিয়ন ডলার! আমিও একজন প্রবাসী। বিপর্যস্ত কয়েকটি পরিবারের কাছে আমিও টাকা পাঠিয়েছি। এজন্য ২ শতাংশ প্রণোদনার চিন্তা করিনি। আমার ধারণা- কোনো প্রবাসীই ২ শতাংশ প্রণোদনা মাথায় নিয়ে টাকা পাঠাননি।

প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠান যে দায়িত্ব বোধ থেকে, সেই দায়িত্ব বোধের ছিটেফোটাও দেশের রাজনীতিবিদরা ধারণ করেন না। ফলে অপ্রয়োজনীয় আত্মম্ভরিতায় তারা গা ভাসান। এবং এক প্রকার প্রবাসীদের রক্তঘামের উপর দিয়েই তারা ক্ষমতার মসনদ রক্ষা করেন! বাংলাদেশের যে ২৬ তরুণ-যুবক লিবিয়ায় বেঘোরে প্রাণ হারালো, তাদের নিয়ে কোনো রাজনীতিবিদের মুখ থেকে একটি কথাও উচ্চারিত হলো না! ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবিতে, দক্ষিণ আমেরিকার বনে জঙ্গলে, বার্মা এবং থাইল্যান্ডের জঙ্গলে যে কত তরুণ যুবকের মৃত্যু হচ্ছে দেশ থেকে পালাতে গিয়ে, সে সবেরও কোনো পরিসংখ্যান নেই!

পত্র-পত্রিকাগুলোও খুবই আনন্দের সঙ্গে কেবল ডলার আর প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে মধ্যবিত্তের লোভের আকাশে বিদ্যুতের চমক দিয়ে যায়। এই চমক রাজনীতিবিদদেরও বিনাভোটে রাজত্ব করার লাইসেন্স দেয়। এই রেমিটেন্স এক শ্রেণির পরজীবী গোষ্ঠীকে ব্যাংক লোপাটের সুযোগ করে দেয়। দেশের তরুণ যুব সমাজকে দেশের উৎপাদন যন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাখা, দেশের সম্পদ দেশের ভেতরে রাখার মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের সরকার এবং প্রশাসন যন্ত্র যেমন দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার ঠেকাতে পারে না, তেমনি তরুণ প্রজন্মকেও ঠেলে দেয় মৃত্যুমুখে!

খোঁজ নিলে, জরীপ চালালে দেখা যাবে হয়ত দেশের ৯০ ভাগ তরুণ যুবকই আর দেশে থাকতে চায় না। যে করেই হউক, দেশের মাটি ছাড়তে চায়। অথচ এই মাটিতেই সোনা ফলিয়ে দেশের কৃষক কৃষিতে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে। বিদেশিরা এসে ব্যবসা-বাণিজ্য করে নিজেদের ভাগ্য গড়ে এ দেশেই!

Center for American Progress এ একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল অনেক আগে। যার শিরোনাম ছিল- Putting a Price on Human Life: The Costs and Benefits of Cost-Benefit Analysis। এ নিবন্ধে বলা হয়- একটি সড়ক অথবা সেতু বানাতে আমরা লাভ-খরচের হিসাব করি। কিন্তু মানুষের জীবন যদি অমূল্য সম্পদ হয়, তবে আমাদের সমস্ত পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে থাকা উচিত ‘মানুষ’!

মানুষের জীবন এবং নিরাপত্তার বিনিময়ে যেন আমরা বর্তমানের লাভের হিসাব না করি। এটি এমন একটি ভয়ানক পথ, যে পথে যুদ্ধ ও হিংসার প্লাবন ঘটে। রাষ্ট্রের ভেতরে ফ্যাসিবাদের বিকাশ ঘটে। এবং ফ্যাসিবাদ মানুষের জীবনের বিনিময়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রয়াস চালায়!

বাংলাদেশ বদলাচ্ছে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সব সূচকে। এই বদলাবার জন্য কৃতিত্বের দাবিদার আমাদের তরুণ ও যুব সমাজ। এদের মেধা ও রক্ত ঘামে কৃষি ও শিল্পের সূচকগুলো উঁকি দিচ্ছে। যদি তাই সত্যি হয়, তবে দেশের তরুণ যুব সমাজকে দেশের ভেতরেই রাখতে হবে।

দেশের তরুণ যুব সমাজকে বিদেশের বন্ধুর, অনিশ্চিত যাত্রায় ঠেলে দেয়া নয়। বরং দেশের ভেতরেই নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে ব্রতি হওয়ার আহবান জানানো উচিত। যারা দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে মাঝেমাঝেই প্রেস কনফারেন্স করেন, তাদের চিন্তার কেন্দ্রে আনতে হবে তরুণ সমাজকে প্রণোদনার বিষয়টি।

যে তরুণ চার লাখ টাকায় মৃত্যু পরোয়ানা কিনে লিবিয়া যায়, সে ইচ্ছা করলে দুই লাখ টাকা দেশীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ করে নিজের এবং পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে পারে। এই চেতনা হয়ে উঠুক আমাদের পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়নের সর্ব ক্ষেত্রে।

আমরা যেন Cost and Benefit Analysis (CBA) এর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক এবং গোষ্ঠী স্বার্থকে প্রাধান্য না দেই। আমার কাছে অনেক তরুণ আমেরিকা ইউরোপে পাড়ি জমানোর পরামর্শ চায়। আমি তাদের ক্ষোভ, অভিমান সব নীরবে শুনে শেষ পর্যন্ত বলি- পরিশ্রম করে দেশেই ভাগ্যোন্নয়নের চেষ্টা করো। আমার এই পরামর্শ নিঃসন্দেহে দেশের রাজনীতিবিদ কিংবা বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মত নয়!

আমরা সবাই মিলে ফেরাতে পারি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে। তারা যা পছন্দ করে, ভালবাসে সেটাকে প্রাধান্য দিয়ে। সর্বপোরি দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি উন্নয়নে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে। তারা কখনো হতাশ কিংবা নিরুৎসাহী হবে না, যদি আমরা তাদের মতামতকে প্রাধান্য দেই।

আর দেশের তরুণ যুব সমাজকে আমরা প্রাধান্য দেবই না বা কেন? এই তরুণ যুবক ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক মিলে অস্ত্র না ধরলে কি আমরা দেশটা স্বাধীন করতে পারতাম? এরাই তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, একই সঙ্গে দেশ গড়ার কারিগর?

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

এই সংক্রান্ত আরও খবর

ফেসবুকে শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে মিথ্যাচার চলছেঃ জনসংযোগ কর্মকর্তা

shahadat

আপনি যা করবেন এবং যা করবেন না

shahadat

কানাডা হঠাৎ এতো বিপুল সংখ্যক সিরিঞ্জ কিনছে কেন?

shahadat

ফেসবুক লাইভের কতিপয় মেডিসিন বিশেষজ্ঞের দৃষ্টি আকর্ষণ!

shahadat

“সাবধান!!! সাবধান!!!”

shahadat

Leave a Comment